উত্তর ২৪ পরগনা: বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গতি বাড়াল রাজ্য পুলিশ। বৃহস্পতিবার মধ্যমগ্রাম থেকে প্রথম বাইকটি উদ্ধারের পর, শুক্রবার বারাসতে উদ্ধার হল অপরাধে ব্যবহৃত দ্বিতীয় বাইকটিও। বারাসতের ১১ নম্বর রেলগেটের ধারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় ওই দু’চাকার যানটি। চন্দ্রনাথের খুনের সঙ্গে এই বাইকের সরাসরি যোগ রয়েছে বলেই প্রাথমিক অনুমান তদন্তকারীদের। এই ঘটনায় ভিনরাজ্যের যোগসূত্র আরও স্পষ্ট হওয়ায়, সূত্র খুঁজতে রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে বলে খবর।
তদন্তে ‘সিট’, বাইকের মালিকানা যাচাইয়ে তৎপরতা
চন্দ্রনাথ খুনের রহস্যভেদে বৃহস্পতিবারই রাজ্য পুলিশের তরফে সাত সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছিল। সিআইডি-র ডিআইজি পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে এই দলে রয়েছেন বারাসত পুলিশ, এসটিএফ এবং সিআইডি-র অভিজ্ঞ আধিকারিকরা।
তদন্তকারী সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার মধ্যমগ্রাম চত্বর থেকে উদ্ধার হওয়া প্রথম বাইকটিতে ভুয়ো নম্বরপ্লেট ছিল। শুধু তাই নয়, বাইকের ইঞ্জিন নম্বরও ঘষে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যাতে মালিকের পরিচয় গোপন রাখা যায়। বারাসতে উদ্ধার হওয়া দ্বিতীয় বাইকটির ক্ষেত্রেও ইঞ্জিন নম্বর ঘষে তুলে দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ বর্তমানে বাইক দুটির আদি মালিকানা যাচাইয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। অনুমান করা হচ্ছে, চন্দ্রনাথকে নিঃশংসভাবে খুনের পর দুষ্কৃতীরা বাইকে করে রেলগেটের কাছে পৌঁছায় এবং সেখানেই বাইক ফেলে রেখে অন্য পথে পালিয়ে যায়।
সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: দেড় মাস আগেই ছক?
গত বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামে নিজের আবাসনের সামনে ভয়াবহভাবে খুন হন চন্দ্রনাথ রথ। সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, চন্দ্রনাথের গাড়ির সামনে প্রথমে একটি চারচাকার গাড়ি এসে দাঁড়ায়, যা তাঁর গতিপথ রোধ করে। এরপর দু’পাশ থেকে দু’টি বাইকে করে আসা দুষ্কৃতীরা পর পর গুলি চালাতে শুরু করে। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক। তাঁর গাড়ির চালকও গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের অনুমান, এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’ বা সুপারি কিলিং। অন্তত এক থেকে দেড় মাস আগে এই খুনের ছক কষা হয়েছিল। তদন্তকারীরা জানার চেষ্টা করছেন, মাসখানেক আগে চন্দ্রনাথের সঙ্গে কারও কোনও বড় বচসা বা এমন কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, যার জেরে তাঁকে খুন করার প্রয়োজন পড়তে পারে।
ভিনরাজ্যের যোগসূত্র ও ‘টাওয়ার ডাম্প’ প্রযুক্তি
খুনের ঘটনার নেপথ্যে ভিনরাজ্যের পেশাদার খুনিদের হাত রয়েছে বলে জোরালো সন্দেহ পুলিশের। এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই ‘সিট’-এর আধিকারিকরা ভিনরাজ্যে গিয়েছেন। তদন্তকে ভুল পথে চালিত করার উদ্দেশ্যেই দুষ্কৃতীরা বাইক এবং ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া চারচাকার গাড়িটিতে ভুয়ো নম্বরপ্লেট ব্যবহার করেছিল। পুলিশ ইতিমধ্যেই সেই চারচাকার গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাওয়া একটি লাল রঙের গাড়ির সন্ধান চালাচ্ছে।
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে মোবাইল ফোনের গতিবিধিও খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের পরিভাষায় যাকে ‘কল ডাম্প’ বা ‘টাওয়ার ডাম্প’ বলা হয়। এই প্রযুক্তির সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে, ওই এলাকার মোবাইল টাওয়ারে কোথা থেকে কার কাছে ফোন গিয়েছিল এবং কারা সক্রিয় ছিল, তা ফোন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কাছ থেকে জানা সম্ভব। অনুমান করা হচ্ছে, দুষ্কৃতীদের কাছে ভিনরাজ্য থেকে ফোন এসেছিল। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তৃণমূলের হাত রয়েছে বলে বিজেপি নেতৃত্ব সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেও, পুলিশ এখনই রাজনৈতিক যোগ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। ঘটনায় এখনও কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় এলাকায় উত্তেজনা রয়েছে।